কালবৈশাখীর পুতুল

জীবন সংগ্রামে পিছিয়ে পড়া একদল মানুষ, ভৌগলিক অবস্থান যাদেরকে আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে দূরে রেখেছে।

 

উপকূলের একটি গ্রাম, না আমি গ্রাম বাংলার সৌন্দর্য নিয়ে বলছি না। এক অবহেলিত জনগোষ্ঠীর কথা বলছি, এক বঞ্চিত সমাজের কথা বলছি। নদীর জল যেখানে জমিতে উর্বরতা আনে না, রুক্ষ আর অনুর্বর করে দেয় ভূমিকে। বৈশাখ যেখানে আনন্দ বয়ে আনে না, বয়ে আনে স্রোতের ভয়, স্মরণ করায় প্রত্যক্ষেই শেষ হয়ে যাওয়া আশ্রয়টুকু।

 

রহিমা, গ্রামের আর দশটা মেয়ের মতোই। সেও নদীর স্রোতে খেলা করে, চরে বালু-কাঁদার ঘর বানিয়ে শৈশব উপভোগ করে। কখনো মায়ের সঙ্গে চরে মাছ গুনে দুপুর পার করে।

 

রহিমার মায়ের নাম জামিলা। জামিলা স্বামীকে হারিয়েছে এক কালবৈশাখীর রাতে। বাবা-হারা মেয়েটাকে নিয়ে নদীর তীরে বসবাস, তাদের জীবন নির্বাহের উপায়ও সেই সর্বনাশা নদীটাই।

 

রহিমা যখন নদীতে খেলছিল, মায়ের জলের আঁচল থেকে একটি কাদামাখা পুতুল পেলো। সঙ্গে সঙ্গে সে দৌড়ে মাকে সেটি দেখালো। মা পুতুল হাতে মেয়ের মলিন মুখখানা দেখলো আর বলল, “নদীর স্রোতে এমন শত স্বপ্ন ঝরে যায়।” নদীর বাঁধ যেমন তীব্র স্রোতকে রাখতে পারেনি, জামিলাও যেন আজ তার নয়নের অশ্রু আটকে রাখতে পারল না। করুণ স্মৃতি তার বুকে, তীব্র ঝড়ে কূলে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতো আঘাত করতে লাগলো।

 

জামিলারও গ্রাম বাংলার আর দশটা সংসারের মতো রঙিন সংসার ছিল। গোলা ভরা ধান, মাঠ ভরা ফসল, আর গোয়ালভরা গরু-বাছুর ছিল। অন্যদের মতোই সংসার গোছাতে, ঘর লেপতে, মাঠে গরু নিয়ে যেতে আর ফসল মাড়াই করতে করতেই সকাল বেয়ে সন্ধ্যা নামতো। কখনো রাতে পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে বাগানের বড় গাছটার সাথে বাঁধা উঁচু মাচাটায় গিয়ে বসতো। কখনো কখনো জোনাকির আলোর মতোই রাতের আঁধারে তার স্বপ্নগুলো রঙিন রংধনু হয়ে ধরা দিত। আবার কখনো বৈশাখের বিকেলে সেও ডাহুক পাখির মতো মাঠে ছুটে বেড়াতো।

 

সেদিনও বৈশাখ ছিলো। পশ্চিম গগনে বাগানের বড় গাছটার সবুজ পাতাগুলো কালো মেঘের মাঝে যেন আরও ঘন সবুজ রং ধারণ করেছে। ঘন কালো আকাশ থেকে একটি সাদা বক গাছটার মগডালে এসে বসেছে— যেন কোনো শিল্পী রঙ-তুলি দিয়ে ভয়ংকর এক রাতের দৃশ্যপট আঁকছে। জামিলা গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত মেয়ে। বিজ্ঞজনের মতো গভীর চিন্তাধারা তার নেই। তার চিন্তা গরুগুলোকে মাঠ থেকে গোয়ালে নিয়ে আসা, মাঠের ফসলগুলোকে বাঁচানো, যেন ঝড় তাদের দলিত না করে— এগুলোই তার ভাবনার জগত।

 

কেই বা জানতো, এই কালবৈশাখী শুধু তার ফসলকে নয়, তার রঙিন জীবনকেও লবণাক্ততায় অনুর্বর ও ধূসর করে দেবে। রহিমা তখন সবে মাত্র পাঁচ বছর পড়ল। গ্রামে তখন বৈশাখের মেলা বসেছে বড় বাগানটার পেছনে। বিকেলে ঘন কালো মেঘ যখন কালো আকাশে ঢেকে ফেলেছে সবকিছু, জামিলা শুনতে পায় চিরচেনা সেই সুর— “ও রহিমার মা শুনছো? গরুগুলোকে কি নিয়ে আইছো?” জামিলা একটু বিরক্ত হয়েই বলে ওঠে, “ঘরে মেয়ে রেখে কেমনে যাই?”

 

রহিমার বাবা মেলা থেকে নিয়ে আসা পুতুলটি জামিলার হাতে দিয়ে মাঠের দিকে গরু আনতে চলে যায়। জামিলা কি জানতো, এই চিরচেনা পথ দিয়ে রহিমার বাবা আর ফিরবে না? সেই চিরচেনা সুরে আর তাকে ডাকবে না।

 

সন্ধ্যার সাথে সাথে ঝড় শুরু হলো। সূর্য পশ্চিম গগনে হেলে পড়তেই রহিমার ছোট চাচা দৌড়ে ছুটে এলো। সে এক টানে রহিমাকে দোলনা থেকে কোলে তুলে নিল। জামিলা কিছু বোঝার আগেই দেখল, বড় পুকুরের পাশ দিয়ে তীব্র স্রোতে জল ঢুকছে। ছোট চাচা জামিলা আর রহিমাকে নিয়ে নদীর পাড়ের বড় রাস্তার উপরে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিল।

 

তার সাজানো সংসার, তার কুটির ও তার গ্রাম— সবকিছুই সর্বনাশা নদীর স্রোত গ্রাস করে নিচ্ছে। নজের চোখে এগুলো দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। মাঠের সবুজ ফসল, গোয়ালের গরু, আর গাছের কাঠবিড়ালিরা— সবাই আজ তার মতো অসহায়। চারপাশে ধ্বংসলীলা, অশ্রুসিক্ত চোখে সবাই তাকিয়ে দেখছে।

 

হঠাৎ জামিলার স্বামীর কথা মনে পড়ল। আর সে বলল, “ভাই, ওর বাপ তো ফিরলো না।” রহিমার চাচা বলল, “হেই তো, বাধ বাঁধতে গিয়েছিল।” এ কথা শুনে রহিমার মা স্তব্ধ হয়ে মাটিতে বসে পড়ল। তার হৃদয়ে আজ যেন কিসের বড় শূন্যতা। নদীর লবণাক্ত পানির মাঝে গাছগুলো যেমন বেঁচে থাকার জন্য মিষ্টি পানির শূন্যতা অনুভব করে, তেমনই অনুভব করল সে।

 

একটা দমকা হাওয়ার সাথে ক্ষুরধার স্রোত জোনাকির বাসাগুলোকে নিমেষে তছনছ করে দিল।

 

লতিফ কাকা, রহিমার বড় দাদা, রহিমার বাবার সাথে বাধ বাঁধতে গিয়েছিল। প্রবল স্রোতে নিজেকে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে রাখতে পারলেও রহিমার বাবাকে আটকে রাখতে পারেনি। ভালোবাসা-স্নেহ দিয়ে তো আর স্রোতকে আটকে রাখা যায় না। লাশটাকে স্রোত গ্রামের শেষের বন পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।

 

ঘটনার বর্ণনার সময় লতিফ কাকার দু’চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে। বৃষ্টির মাঝেও সেটা স্পষ্ট ফুটে ওঠে। কাকার কথাগুলো যেন বৃষ্টির মাঝে বজ্রপাতের গর্জনের মতো রহিমার মায়ের কানে বাজতে থাকে। আজ বৃষ্টি না হলে হয়তো চোখের জলেই তাকে ভিজতো।

 

বলার সময় লতিফ কাকার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায় ফাঁকে ফাঁকে— যেন স্রোতের ঢেউগুলো একটু থেমে থেমে আরও প্রবল হয়ে আছড়ে পড়ছে রহিমার মায়ের বুকের মাঝে। হঠাৎ ঢেউগুলো থামল, আর আরও প্রবল হয়ে শক্তি নিয়ে লতিফ কাকার কণ্ঠে বেরিয়ে এলো, “আমার বাপটার জন্য একটুখানি জমিও পাইলাম না। রহিমার বাবাকে মাটি দেওয়ার জন্য ভারাও একটু উঁচু জমি পাইনি।”

 

সব জমি পানির নিচে ঢুকে গেছে। চেনো, জোনাকির আলোর মতো স্বপ্নগুলো দিনের আলোয় অতল গভীরে ডুবে গিয়েছে।

 

নদীর উজান নেমে গেলে পানি একটু কমে যায়। বড় গাছটার মাঝে যে মাচাটা ছিল, ওটা দেখা যায়। কিছু কাঠবিড়ালি ছানা রহিমার মতো নিরুপায় হয়ে ওখানে আশ্রয় নেয়। না আছে খাবার, না আছে পান করার পানি— এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। যেন জীবনের সকল উপকরণকে চোরাবালির মতো নদী নিজের মাঝে শুষে নেয়।

 

রহিমার মা তার জীবনসঙ্গীকে একবার দেখার সুযোগ পেয়েছিল। কলার ভেলার মাঝে নিস্তব্ধ দেহটার সলিল সমাধি হলো। নদীর স্রোত নিস্তব্ধ দেহটাকে তার গর্ভে নিয়ে নিল চিরদিনের জন্য।

 

ঝড় কমল, বৃষ্টি থামল, সূর্য তার আলো নিয়ে ফিরে এলো। তবুও দুঃখ থেমে রইল না। নদীর তীরে বড় রাস্তাটার উপরে ঘর বেঁধেছিল তারা। ওদিকে জল দিয়ে মাছের পোনা বিক্রি করে জীবন চলছিল তাদের। ছোট চাচাই ছিল পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তি।

 

আরও এক কালবৈশাখী ঝড়ে নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিল সে, স্রোত তার ভাইয়ের মতো তাকেও রক্ষা দেয়নি। তার দেহটাকে দেখার সুযোগ আর কারো হয়নি। কলার ভেলাটাও তার কপালে জুটেনি।

 

বাকি রইল রহিমা আর রহিমার মা। এক কলসি পানির জন্য নির্জন ঘরে রহিমাকে একা রেখে পাড়া থেকে পাড়ায় ছুটে বেড়াত সে। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আজ তারা বেঁচে আছে— কখনো খেয়ে, কখনো খাবারের আশায়।

 

রহিমার মা একদিন পুতুলটিকে গ্রামের শেষের বনটার কাছেই পেয়েছিল, যেখানে তার বাবার নিস্তব্ধ দেহটাকে পাওয়া গিয়েছিল। নদীর স্রোত রহিমাকে ও তার মাকেও নিতে পারতো বাবার সাথে। হয়তো সৃষ্টিকর্তা তাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন তোমাদের কাছে গল্প হয়ে পৌছনোর জন্য।

 

রহিমার মা পুতুলটাকে ঘরের বড় দেয়ালের উপর যত্নে গুছিয়ে রেখেছিল। হয়তো কোনো এক কালবৈশাখী আবারও পুতুলটাকে স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এবার রহিমার মা কাদামাখা পুতুলটিকে ধুয়ে দেয়ালের উপর দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে দেয়। সে জানে, ভালোবাসা-যত্ন-মায়ার বন্ধন দিয়ে স্রোতকে বেঁধে রাখা যায় না।

 

এমন শত রহিমার পুতুল তুমি প্রতিস্রোতে ভেসে যেতে দেখবে। কত রংবেরঙের বৈশাখী মেলার পুতুল! এগুলো পুতুল নয়— পুতুলরূপী শত শত রাতের আঁধারের বাগানের জোনাকি। উপকূলের তীব্র স্রোত আর বাতাস তাদেরকে নদীর ঢেউয়ের মাঝে আছড়ে ফেলেছে। প্রতিটি বৈশাখের পুতুল যেন উপকূলের এক একটি রহিমা।

 

আবারও হয়তো কোনো বৈশাখে তুমি তাদের দেখবে নদীর ঢেউয়ের ভেতর হতে কূলে আঁছড়ে পড়তে। রহিমাদের গল্প তুমি বৈদ্যুতিক আলোর নিচে পাবে না। রহিমাদের দেখতে হলে জোনাকির বাগানে আসতে হবে, স্রোতের মাঝে খেলা করতে হবে। তাহলেই জোনাকির বাগানে কোনো এক কালবৈশাখীর তীব্র স্রোতে রহিমার পুতুলকে পাবে।

 

আবারও কোনো স্রোত রহিমাকে নিয়ে যাবে ওই বনের শেষ গাছটার গুঁড়ির পাশে।

তারিখ: ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫

প্রকাশক: সাবিহা হক, অধ্যাপক, ইংরেজি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

all rights reserved by - Publisher

Site By-iconAstuteHorse