নো ম্যানসল্যান্ড

মমতাজ তার বর্তমান অবস্থান বুঝতে চায়, পারলে দূরবীন দিয়ে হলেও দূর থেকে ভবিষ্যৎ দেখতে চায়।  সে শাহজাহানকে সহজে বিশ্বাস করে না, মেজাজ মর্জি বুঝে কখনও বিশ্বাস করে, কখনও করে না। শাহজাহান যখন দূরে তাকিয়ে কথা বলে, সেটা বুঝতে হবে কল্পনা করছে বা ভান করছে। যখন মমতাজের  চোখে চোখ  রেখে কথা বলে তখন মমতাজ ধরে নেয়  সে ভয়ংকর সত্য প্রকাশ করছে।  যেভাবেই হোক, এই মন্দ মানুষটার সাথে গাঁটছড়া বাঁধতে হয়েছে মমতাজের। এই  জেদি, পাজি, বদমেজাজি ও হাড়ে হারামজাদা শাহজাহানকে তার প্রয়োজন। মাটির ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে তার নিজের প্রয়োজনেই মমতাজ শাজাহানের সাথে কথা বলে যায়।

৭০০ ফুট কত দূর বা সীমানাডা বুঝাইয়া দিবা শাজাহান ভাই?

শাজাহানের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ওঠে।

এত  বোঝার দরকার আছে তর?

ঝাঁজালো গলায় বলে শাজাহান।

সামনে ঐ পুকুর, উত্তরে বাঁশ ঝোপ, পূবে ধান ক্ষেত, এইডা  তোর সীমানা। সাবধান এইডার বাইরে সহজে পা দিবি না। যদি দিস তাইলে শিয়াল কুত্তা তরে ছিঁড়া খাইব। আমি তরে বাঁচাইতে পারব না।

স্পষ্ট আর  থেমে থেমে বলে শাজাহান। যেন সে কঠিন সত্য উচ্চারণ করে।

মমতাজ শাজাহানের কথায় খুব একটা পাত্তা দেয় না। কিন্তু নিজের সীমানা বোঝার চেষ্টা করে। এই সীমা সে অতিক্রম করতে পারবে না, কিন্তু তার সীমানার ভেতরে অন্যদের প্রবেশ করতে বাধা নেই। চমৎকার ব্যবস্থা! এক মাস হয়ে গেল শাজাহান মমতাজকে বর্ডার দিয়ে পাচার করার ব্যবস্থা এখনও করতে পারেনি। কিন্তু আশা দিয়ে চলেছে। শাজাহান যা বলে তাই করে – কত মাইয়া মানুষ পার করলাম, কত  ডেয়ারিং অপারেশন।

আবার এদিকে ওর চলাফেরায় দিনের পর দিন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখছে।

শাজাহান সিগারেট ফুঁকছে; মুখ থেকে কসরত করে বের করা ধোঁয়ার রিং মিলিয়ে যাবার আগে শাজাহানের আশেপাশে ঘুর ঘুর করছিল। ওর গায়ে রঙ চং, কনুইয়ের উপর গুটিয়ে রাখা ফুল-হাতা  চেক শার্ট আর নীল রঙের জিনসের প্যান্ট। মাথায় ভেরেন্ডা  ঝোপের মত উসকো খুসকো চুল; চোখের তারা পিট পিট করছে; মনে হয়  কোন মতলব আঁটছে।

শাজাহান বাংলাদেশ-পশ্চিম বাংলা বর্ডারে মানুষ পাচার করে। মেয়েমানুষ পাচারে সে এক্সপার্ট। সোনা চোরাচালানও করে সুবিধামত। আসল পয়সা কামায়  সে সোনা চোরাচালান করে। কিন্তু  মেয়েমানুষ পাচার তার কাছে নেশার মত। মাদক  চোরাচালানিরা শাজাহানকে দলে টানতে চায়; বলে, আসেন আমরা সিন্ডিকেট করি। আসল উদ্দেশ্য এমপির সাথে লাইন করা। শাজাহান পাত্তা  দেয় না। তার এক কথা, এই সব ছ্যাঁচড়া কাজ, কিন্তু ঝামেলা  বেশী। এর মধ্যে সে নাই। তবে  সে মাদক  চোরাচালান করেই এই লাইনে তার কেরিয়ার শুরু করেছিল।

ঠক ঠক

মাটির ঘরের জং পড়া টিনের চাল  পেরিয়ে উপরে উঠে যাওয়া বিরাট এক তেঁতুল গাছের আধা মরা ডালে একটা কাঠঠোকরা পাখি ক্রমাগত ঠোকর দিয়ে যায়। মরা ডালে কিছু শুঁকিয়ে যাওয়া তেঁতুল ঝুলছে। অনেক পাকা  তেঁতুল মাটিতে পড়ে নষ্ট হচ্ছে।

বাইরে যদি পা দেই, কি করবা আমারে? আমার ইজ্জত নিবা, শাজাহান ভাই? আমি  তো সব সময় রেডি।

জানোস না, তোর ইজ্জত আমি যখন ইচ্ছা তখন নিতে পারি, তোর ইজ্জত আমি কেনা বেচা করতে পারি।

দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে শাজাহান।

আমি দৌলতদিয়ায় তরে বেইচা দিয়া বানিশান্তার হাটে কিনা আনতে পারি।

কি ভয়ানক! আমি কি কেনাবেচার মাল?

এই দিনের বেলা অন্ধকারের মত চারিদিক থেকে আসা ভয়, ভীতি, সন্ত্রাস মমতাজকে আষ্টে পৃষ্ঠে অজগরের মত  পেঁচাতে থাকে। মমতাজের যেন দম বন্ধ হয়ে যাবে। এই মূহুর্তে শাজাহান তার কাছে একটা রিয়েল টেরর।

ক্যাট ক্যাট

মমতাজ চমকে ওঠে। বিকট আওয়াজ করে কাঠঠোকরা পাখি আর এক গাছের মরা ডালের সন্ধানে উড়ে চলে গেল। পাখিটার উদরপূর্তি হয়নি। মমতাজ নিজেকে সামলে নেয়।

একবার তো টেরাই কইরা  দেখলা না। আসলে তোমার সাহস নাই।

মমতাজ মুচকি  হেসে শাজাহানকে কটাক্ষ করে।

ছিনালপনা রাখ। তরে আমি ভাল কইরা চিনি। সিগারেট খাবি? শা

জাহান কাছে এসে মমতাজের মুখের উপর এক পশলা ধোঁয়ার রিং ছুড়ে দেয়। মমতাজ হাত ছুঁড়ে ধোঁয়ার রিং ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেয়, ভান করে খুক খুক কাশে। শাজাহান আবার  ধোঁয়ার রিং ছুড়ে  দেয়। মমতাজ তার কাজ করে, দুজন খেলায় মেতে ওঠে।

এইসব মস্করা রাখ, শাজাহান ভাই। তোমার বগলা, চারমিনার সিগারেট আমার পোষাইবো না। যদি পার আমারে ফাইভ ফিফটি ফাইভ সিগারেট যোগাড় কইরা দেও। তাও যদি না পার, আমারে একটা ডাইল আইনা দিও। বর্ডার পার হইবার আগে ডাইল খাইয়া ব্রেনডা ফকফকা করবার চাই।

ডাইলের দাম চড়া এহন, সাপ্লাই কম। চল তরে আইজকা রাইতে ডাইলের আসরে নিয়া যামুনে, যাবি? তা তো যাবি না।

তুমি কি আসলেই চাও, আমি ডাইলের আসরে যাই? আমি জানি, তোমরা কই ডাইলের মজমা বহাও।

অইছে অহন প্যাচাল রাখ। ভাল কইরা শোন, আমি খোঁজ খবর নিতাছি কবে বর্ডার ক্রস করা যাইব। বর্ডারে খুব টেনশন চলতে আছে এহন।  তোর ধৈর্য্য ধরা লাগবে। দুপুরে বাজার থিকা ভাত তরকারি আনুম, কাবাব রুটি আর ভাল্লাগে না। কি খাবি তুই?

শাজাহান ভাই, অনেকদিন বিরানি খাইনা, পারলে বিরানি আইনো।

বিরানি খাইবার খুব সখ অইছে মমতাজের, এ্যাঁ? তরে ফখরুদ্দিনের কাচ্চি বিরানি ঢাকা থেকে আইনে খাওয়াবোনে। নড়া চড়া করিস না, আমি গেলাম।

বিকেল হয়ে সন্ধ্যা, তারপর রাত নামে। শাজাহান আসে না, আসে না। মমতাজের ভীষণ ক্ষুধা। মমতাজ ঘর  থেকে  বের হয়, দিনের  বেলা ঘরের পেছনে  ঝোপঝাড়ে একটা ডেউয়া গাছ আবিষ্কার করেছিল, সেখানে কাঁচা পাকা  ডেউয়া ঝুলছে। দুইটা পাকা  ডেউয়া  পেড়ে আনে। ঘরে বিট লবণ ছিল, লবণ দিয়ে  ডেউয়ার টক মিষ্টি  কোষ চুষে খায়, টক মিষ্টি  খেয়ে ক্ষুধা আরও টঙ্গে উঠল। চাপকল থেকে আঁজলা ভরে পেট পুরে পানি খেয়ে কতটুকই বা ক্ষুধা নিবৃত্ত হয়? শুধুই কি পেটের ক্ষুধা? মমতাজের অনেক সময়  দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষুধা তীব্র হয়, বিশেষ করে দৈহিক আভ্যন্তরীণ চক্রের একটা পর্যায়ে। একটা পুরুষ মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের স্পর্শের জন্য পরান জার জার করে। শাজাহানের মত পুরুষ তা দিতে পারবে কিনা ও জানে না। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় শাজাহানের  সে সক্ষমতা আছে কি না। কিন্তু এই মূহুর্তে শাজাহানই ওর বাদশাহ, এই সিয়ানা খল প্রকৃতি ধুরন্ধর মানুষটাই ওর ভরসা।

রাতে মমতাজের মাটির ঘরের দরজায় টুক টুক শব্দ। মমতাজ প্রচন্ড ক্ষুধা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল, ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙ্গে ওঠে। কে? কে এত রাইতে? আমি শাজাহান। দরজা খোল তাড়াতাড়ি, ছেড়ি খালি পইড়া ঘুমায়। শাজাহান ঘরে ঢুকে দরজা লাগায়।

শোন, বর্ডারে এহন আসলেই খুব কড়াকড়ি, আমি খবর পাইছি। বাহার গ্রুপের  সোনা চোরাচালানের পাঁচ কেজি ওজনের বড় এক লট ধরা পড়ছে। সন্দেহ আছে  সোনা লতিফ আগেই পুলিশরে লটের ব্যাপার জানাইয়া থাকবে। এহন পুলিশ বিডিআর বাহার গ্রুপের লোকজন ধর পাকড় করতে আছে। আমিও মনে অয় লিস্টের মইধ্যে আছি। এমপি স্যারের সন্দেহ তার দলের কেউ বেঈমানী করছে।

এসব কথা শুনে মমতাজের বড় ভয় করে।

শাজাহান নিজের মনে কথা বলতে থাকে। মমতাজের ভয় তার চোখে ধরা দেয় না।

বর্ডার দিয়া এহন একটা মাছির পার হইবার উপায় নাই, বুঝলি। আমার কিছু দিন এমপি স্যারের প্রটেকশনে চাইপা থাকতে অইব। তারপর ব্যাপারডা ঠান্ডা হইলে বিডিআর  থেইকা নতুন  রেটে গেট পাস নিতে অইব, এমপি স্যার যোগাড় কইরা দিব।  তোর কাম অইল নড়া চড়া, আওয়াজ কম করা। বিরানি নিয়া আইছি তর লাইগা, এমপি স্যারের দাদার ওরসের মিলাদের  স্পেশাল শিন্নী, মইষের  গোশতের বিরানি। এমপি স্যার ওরসে ভোলার চর থেইকা আনা পঞ্চাশটা মহিষ হোতাইছে পাঁচ গেরামের মানুষ খাওয়াইবার লিগা। আয় দুই জন মিলা বিরানি খাই। ওরসের শিন্নী, খাইলে সোয়াব আছে। সফট ড্রিঙ্কের একটা ক্যান টাস করে খুলে শাজাহান, যেন সে তার বুক চিরে মমতাজকে দেখাতে চায়। তারপর পরিতৃপ্তির সাথে চুমুক দেয়। শাজাহানরে মনে হয় অন্য একজন মানুষ। এই অনুভূতি একটা ঘোরের মত লাগে মমতাজের।

বাকি রাত তুমি এইহানে থাইকা যাও, শাজাহান ভাই। তুমি কত দিন পলাইয়া থাকবা, কে জানে? যদি ধরা পড়?  তোমার সাথে দেহা না অয়! তুমি এইসব কাম বাদ দেও।

এত পীরিত আমার লেইগা? অন্ধকারে শাজাহানের চোখ  যেন জ্বল জ্বল করে। বাদ দিবার লাইগা এই পথে আইছি? তুই বর্ডার কেন পার অইতে চাস ক আমারে? চিন্তা করিস না, তরে বর্ডার পার করায়ে নিমুই, আপাতত: সাবধানে থাকিস।

আমারে তাড়াতাড়ি বর্ডার পার কইরা দেও, শাজাহান ভাই। তুমিও বাঁচ, আমিও বাঁচি। মমতাজের কণ্ঠের দুশ্চিন্তা, আকুতি, উদ্বেগ শাজাহানের রাডারে ধরা পড়ে না। লও আমরা এক সঙ্গে বর্ডার পার অই। তারপর যা অইবার অইব। আমরা কিছু পয়সা কামাইয়া তাজমহল দেখতে যামু। তারপর মুম্বাই।

শাজাহান গা করে না। এইসব স্বপ্ন দেখার মানুষ শাজাহান নয়।

মনে রাখিস এমপি স্যার তর খোঁজ খবর নিতে আইতে পারে। মাইয়া মানুষের জন্য স্যার বড় দিল দরিয়া। কি বুঝলি? বর্ডার পার অওয়া এত সোজা! ঘাটে ঘাটে ট্যাকসো দেয়া লাগে। শাজাহান একটু বিরতি দেয়। স্যাররে খুশী করতে পারবি না? পারবি তুই। মনে রাখিস, স্যার ব্যস্ত মানুষ।

মাটির ঘরে একটা কুপি জ্বলছে, এ ছাড়া  কোন আলো  নেই, এই ম্যাটম্যাটে  আলোতে ঘরের একটা  কোণামাত্র ফ্যালফ্যাল করে চায়। কুপির তেল কমছে,  সলতের আলো মিইয়ে আসছে। শাজাহান কুপির দিকে চেয়ে ধীরে ধীরে কথা বলে।

এমপি স্যাররে খুশী করতে পারলে ভিআইপি চ্যানেল দিয়া বর্ডার পার অইবার পারবি। কপাল খুইলা গেলে সল্টলেক সিটিতে স্যারের ফ্ল্যাটে রক্ষিত অইয়া পায়ের উপর পা উডাইয়া আরামে থাকতে পারবি। সোনার পালঙ্কে শুইয়া থাকবি, আমি হাঁচা কইতাছি। জানোস না এমপি স্যার  সোনা চোরাচালানের গডফাদার, তহন আমারে ভুইলা যাবি। তুই যদি চাস, আমি স্যারের ফ্ল্যাটের সিকিউরিটি গার্ড হইয়া তর কাছে থাকবানে। বুঝলা, সোনার চান পিতলা ঘুঘু। শাজাহান ফুঁ দিয়ে কুপি নিভিয়ে দেয়। শুইয়া পড়, আজানের সময় আমারে জাগাইয়া দিস।

গত কিছুদিন শুধু মানুষ মরার খবর আসে। বর্ডারে কারা যেন খুন হয়ে যাচ্ছে। এমপি সাবের হাত আছে এইসবে। সোনা পাচারকারী দলের ভিতর নানা রকমের বেঈমানি। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। শাজাহানের জন্য মমতাজের বড় ভয় হয়। এইখানে, এই কোনো মানুষের না যে জায়গাডা, ইন্ডিয়া আর বাংলাদেশের মাঝখানে  যেয় জায়গা, সেইখানে লাশগুলা পড়ে থাকে।

আবার দরজায় ঠক ঠক শব্দ। শাজাহান মমতাজকে বলে, আমারে এমপি স্যার খবর পাঠাইছে, যাইতে অইব। এত রাত্রে ডাকল স্যার আমারে? ব্যাপারডা কি? বর্ডারে কোন সমস্যা? জরুরী কাজ হইতে পারে, ঢাকা  থেইকা  সোনার বড় লট আইছে মনে অয়।

শাজাহান ভাই, তুমি এহন যাইয়ো না। আমার ভাল লাগতাছে না। আমার বাম চোখ ফরফর করতে আছে। মনে অয় তোমার কোন বিপদ আইতাছে। তুমি যাইয়ো না শাজাহান ভাই, আল্লার কিরা লাগে। লও আমরা এইহান থেইকা পলাইয়া যাই।

ঠিক আছে, তুই কোন চিন্তা করিস না। কামডা সাইরা তর কাছে চইলা আসুম। এহন ঘুমাইয়া পড়।

মমতাজের ঘুম আসে না। মমতাজ ফুঁপিয়ে কাঁদে।

 

তারিখ: ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫

প্রকাশক: সাবিহা হক, অধ্যাপক, ইংরেজি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

all rights reserved by - Publisher

Site By-iconAstuteHorse