এক মহীরুহ

কখনো কখনো আমাদের জীবনে আমরা পাই এক বিশাল মহীরুহের সান্নিধ্য, যার ছায়ায় বেড়ে উঠি আমরা লতা, গুল্ম, ছোট্ট চারা হয়ে ।  হঠাৎ কোনোদিন যদি সেই মহীরুহের শাখা-প্রশাখা কাটা পড়ে, কমে আসে তার বিস্তৃতির পরিধি, আমরা  শংকিত হই, আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে।  প্রশ্ন ওঠে, কখনো কোনো কিছু জানতে হলে, কার কাছে যাবো? উদার সেই মহীরুহ বলে উঠে, “আমি না থাকলেও, তোমার কাজের মাঝে আমাকে খুঁজে পাবে তুমি।” ছোট্ট লতা, গুল্মগুলো মহীরুহের শেকড় কে লালন করে নিজেদের মাঝে পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে। প্রফেসর সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন তেমনি এক মহীরুহ যার ছায়ায় বেড়ে উঠেছিলাম আমরা অগণিত ছাত্র ছাত্রী, লেখক ও প্রকাশক।   স্যার এর উৎসাহে আমাদের অনেকেই খুঁজে পেয়েছি আমাদের নতুন কোনো প্রতিভা ও আত্মপরিচয়।  ১০ অক্টোবর ২০২৫, স্যার আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন,কিন্তু রেখে গেছেন তার পরবর্তী প্রজন্মকে।

২০০২ সালে আমরা যখন ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হই, মনজুর স্যার আমাদের “ইন্ট্রোডাকশন টু পোয়েট্রি” কোর্সটি পড়াতেন।  প্রথম দিনের লেকচার গ্যালারির ক্লাসে স্যার আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কেউ কিছু বলতে চাই কিনা।  এক  সহপাঠী  মাইক্রোফোন হাতে জিজ্ঞেস করলো, “স্যার, আমাদের ইংরেজি কবিতা অনেক কঠিন লাগে বুঝতে, আমি বুঝতে পারবো তো ?”

মনজুর স্যার চট করে মাইক্রোফোন আমার হাত থেকে নিয়ে নিলেন, এবং কিছুটা রেগেও গেলেন।  তিনি আমাদের বুঝিয়ে বললেন, “তোমাদের আজ ফার্স্ট ইয়ার এর তৃতীয় দিন কেবল, আমরা কবিতার বইটাও খুলিনি, তুমি কেমন করে বুঝলে যে তোমার জন্য এটা কঠিন হবে?” স্যার এর মূল শিক্ষণীয় বিষয় ছিল, আমরা যেন চেষ্টা না করেই কোনো কিছু সম্পর্কে নেগেটিভ ধারণা পোষণ না করি।   স্যার আমাদের বলতেন চারুকলার প্রদর্শনীগুলো আমাদের যাওয়া আসার পথে যেন আমরা দেখতে যাই।  কারণ সাহিত্য কেবল গল্প বা কবিতা পড়া নয়, বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রে ভালো-খারাপ বিচার করবার দক্ষতা অর্জন করা বা ক্রিটিকাল এপ্রিসিয়েশন এর চর্চা করা।

প্রথম বর্ষে, আমার পরিচালনায়, আমরা ফকরুল স্যার এর “ইন্ট্রোডাকশন টু প্রোজ কোর্স” এ , “মাই ইডিপাস কমপ্লেক্স” এর মঞ্চায়ন করি যা স্যার অনেক পছন্দ করেন।  এর পর দ্বিতীয় বর্ষে আমাকে দায়িত্ব দেন ব্রাউনিং এর “ফ্রা লিপ্পো লিপ্পি” এর ক্লাসরুম প্রোডাকশন করার, যা বেশ জনপ্রিয় হয়।  তৃতীয় বর্ষে স্যার আমাকে বলেন ড. ফউসটাস এর ক্লাসরুম প্রোডাকশন করতে।  আমরা খুব চমৎকারভাবে এই নাটকের “সেভেন সিন্স” এর মঞ্চায়ন করি। মনজুর স্যার এর মানুষের ভিতরের সুপ্ত গুণাবলী বের করে আনার এক ক্ষমতা ছিল যা আমার ছাত্রজীবনে আমি দেখি । আমাদের পারফরমেন্স এর সাংগঠনিক আয়োজনের দক্ষতা স্যার বেশ বুঝতে পেরেছিলেন, এবং বিভাগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভলান্টিয়ার হিসেবে তিনি আমার নাম দিতে বলতেন।

ফার্স্ট ইয়ার এ একদিন, স্যার আমাদের বলেন, “সব সময় তোমরা মনে রাখবে, তুমি যেখানেই যাও, তোমার ব্যবহার আর কাজে যেন আমাদের বিভাগের কোনো অসম্মান না হয়।  যেমন, অনেকেই তোমরা অধঃস্তন কর্মকর্তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করো না, এমনটি যেন না হয়।  আর মেয়েরা, তোমরা যদি বিয়ের পর দেখো , তোমার স্বামী তোমার কাছ থেকে যৌতুক চাচ্ছে বা তোমার উপর অত্যাচার করছে, আমার ফোন নম্বর সেভ করে রাখো, আমাকে কল দেবে । আমি এসে তাকে গুলি করবো।  তোমার জীবন তোমার নিজের, কখনই তার উপর অন্য কেউ আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না।  আর ছেলেরা, যারা বি সি এস কর্মকর্তা হবে, কখনও যদি শুনি, তোমরা ঘুষ খাও, তাহলে আমি তোমাদের এসে গুলি করব। ”

স্যার এর এই কথা গুলো আমাদের কচি, কোমল মনে এমন দাগ কেটেছিল যে, আমাদের ব্যাচ এর সবাই আমরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে চেষ্টা করি সব সময় সবার সাথে সদব্যাবহার করতে।

স্নাতক পর্যায়ের ফলাফল বের হতে না হতেই আমি পাড়ি জমাই অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটিতে, আমার মাস্টার্স সম্পন্ন করার জন্য। এক বছর পর আমি ফিরে এসে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির জন্য আবেদন করি এবং স্যারকে জানাই যে আমার খুব ইচ্ছা ব্র্যাক  বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করব।  স্যার শুধু বললেন, “ঠিক আছে, আমি দেখি।” ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রথম চাকরি, যেখানে আজ অব্দি হয়ে গেলো ১৬ বছর।  স্যার বিভাগীয় প্রধানকে প্রথম ধাপ ইন্টারভিউ এর পরেই আমার এক্সট্রাকাররিকুলার কাজ এবং dynamism নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।  আমি এখনো আমার ছাত্রদের দিয়ে পারফরমেন্স, রোল প্লে করি ক্লাসে যা স্যার এর কাছ থেকেই শেখা।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকর্মী হিসেবে আমি স্যার এর আরেকটি দিকের সাথে পরিচিত হই। আমরা যারা নতুন শিক্ষক, তাদের একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের সাথে এক সেমিস্টার টিচার্স’ অ্যাসিস্ট্যান্ট (টি.এ.) হিসেবে কাজ শিখতে বলা হয়। আমি স্যার এর “ট্রান্সলেশন স্টাডিস” কোর্স এর  টি এ ছিলাম।  স্যার আমার নিজের ট্রান্সলেশন এর অভিজ্ঞতা ও অ্যাপ্লায়েড লিঙ্গুইস্টিক্স এর জ্ঞানকেও এই কোর্স এ কাজে লাগাতে বললেন।  পরবর্তীতে , স্যার এই কোর্সটি আর নেবেন না বলেন এবং আমাকে দিয়ে দেন।  তাঁর আস্থা ছিল যে আমি ভালোই পারবো এই কোর্স পড়াতে, এবং এখনো পর্যন্ত আমার বিভাগে আমিই এই কোর্স পড়াই।

স্যার এর সাথে আরো সুযোগ হয়েছিল জার্নাল এডিটিং টিম এ কাজ করার।  আমাকে রেফারেন্স লিস্ট ও সাইটেশন এবং লেখা সংগ্রহ  করার দায়িত্ব স্যার নির্বিঘ্নে দিয়েছিলেন।  যখন আমি মালয়েশিয়াতে পিএইচডি  করার সিদ্ধান্ত নিলাম, অনেকেই বলছিলেন কেন এশিয়াতে যাচ্ছি, পশ্চিমা কোনো দেশে নয় কেন। স্যার একমাত্র ব্যাক্তি যিনি কখনোই তা বলেননি, কারণ মানুষের নিজস্ব চিন্তাকে তিনি সন্মান করতেন এবং সামান্য চেষ্টাকেও সমর্থন করতেন ।

আমার বিয়ের পর আমি বেড়াতে যাই মালয়েশিয়া আর সিঙ্গাপুর ।  স্যার শুনেই নিজের সিঙ্গাপুর এর সিম কার্ডটি দিয়ে বলেন, “খামাখা আরেকটা সিম কার্ড না কিনে, এটা ব্যাবহার কর।  আমাকে আবার ফিরিয়ে দিলেই হবে।” এমন করে কেউ কি কখনো চিন্তা করেছে? তাঁর এক ছাত্রী দেশের বাইরে যাবে, আর তিনি নিজের সিম কার্ডটা তাকে দিয়ে দিলেন- এ মনজুর স্যারের দ্বারাই সম্ভব।

আমি যখন একজন নতুন মা, অফিস এ আমার ব্রেস্ট পাম্প করতে হতো আমার বাচ্চার জন্য । সপ্তাহে দুই দিন আমি নির্দিষ্ট অফিস রুমটা খালি পেতাম না।  কিন্তু স্যার এর রুম সবসময় খালি থাকতো, কারণ স্যার শুধু সোমবারে আসতেন ক্লাস নিতে।  আমি স্যার কে গিয়ে বললাম, “স্যার, আমি তো নতুন মা, আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে, আপনার রুমটা তো বেশিরভাগ সময় খালি থাকে। ”

আমার চেহারায় সংকোচ দেখে স্যার বুঝে গেছেন যে আমি পাম্প করার জন্য মাঝে মাঝে স্যার এর খালি রুমটা ব্যবহার করতে চাচ্ছি।  তিনি বললেন, “তোমার যখন দরকার হয়, রুম খুলে দিতে বলব রফিক কে। কোনো অসুবিধা নাই। ” একজন পিতা হিসেবে তিনি তাঁর মেয়ের সমস্যার সমাধান করে দিলেন নিমেষেই । আমার বাচ্চাদের যখনি উনি দেখতেন, সব সময় নাতি বলে সম্মোধন করতেন। একই ভাবে, আমাদের সব ছাত্র-ছাত্রীদের বাচ্চাদের আর পরিবার কে তিনি নিজের মনে করে আলাপ করতেন যা দেখে কখনোই বোঝা যেত না যে তিনি একাধারে একজন জাতীয় শিক্ষক, সমালোচক, লেখক ও অনুবাদক।

স্যার এর শিশুসুলভ সেন্স অফ হিউমর আমরা সবাই  ধারণ করি নিজেদের মাঝে।  স্যার এর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল যে তিনি ছিলেন অমায়িক, নিরহংকার ওর বৈষম্যহীন মানসিকতার মানুষ ।  খারাপ ছাত্র বা ভালো ছাত্র বলে তিনি কখনো কোনো বিভেদ করতেন না, সবাই তার চোখে সমান ছিলাম । আমার ছাত্র ও কর্মজীবনে স্যার কে কখনো আমি রাগ করতে দেখিনি কারো উপর।  কোনো ভুল হলে, তিনি কাছে ডেকে নিয়ে আমাদের বুঝাতেন।  স্যার এর মতো মহীরুহ কে হারিয়ে, আমরা যে কি হারিয়েছি, তা ভাবতেই মাঝে মাঝে আমার চোখ ভিজে উঠে।  ওপারে ভালো থাকবেন স্যার, আমাদের বুকের ভিতর আপনার শিকড় আমরা ধারণ করবো বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে।

 

তারিখ: এপ্রিল ৩০, ২০২৬

প্রকাশক: সাবিহা হক, অধ্যাপক, ইংরেজি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

all rights reserved by - Publisher

Site By-iconAstuteHorse