স্মৃতিতে অম্লান: সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (১৭ জানুয়ারি, ১৯৫১ – ১০ অক্টোবর, ২০২৫)
ফিরোজ মাহমুদ আহসান
মূল: ফকরুল আলম
অনুবাদ: ফিরোজ মাহমুদ আহসান
মনজুর ভাইয়ের সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর, ঢাকা ক্লাবের এক আড্ডায়। আমরা দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় একসাথে কাটিয়েছিলাম। আমরা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও আমি তাঁকে সবসময় ‘ভাই’ সম্বোধন করতাম। সেই আড্ডায় অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি আমরা আমাদের এই অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিবর্তনের ধারা নিয়ে আমাদের অস্বস্তির কথা আলোচনা করেছিলাম। তিনি উচ্চমানের বাংলা সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলম-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তহবিলের অনিশ্চয়তার কারণে তিনি মনে করছিলেন যে, এই পত্রিকার সম্পাদনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে তিনি হয়তো বেশিদিন দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি নিয়েও তিনি বেশ অসন্তুষ্ট ছিলেন, যা গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কিছুটা অস্থির হয়ে আছে। সর্বোপরি, মনজুর ভাই এবং আমি এই ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতার ৫০ বছর পূর্ণ করেছি; আমরা দুজনেই এই বিভাগের অংশ হতে পেরে গর্বিত ছিলাম এবং সবসময় অনুভব করতাম যে বিভাগটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ। কিন্তু বিভাগের গুটিকয়েক শিক্ষার্থীর কিছু অনভিপ্রেত অবস্থানের কারণে আমাদের মতো সমমনা সহকর্মীদের পক্ষে সেখানে স্বাধীনভাবে শিক্ষকতা করা বা আমাদের প্রিয় প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা উপভোগ করা কীভাবে সম্ভব? সেই শিক্ষার্থীরা যেন আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করতে এবং ক্যাম্পাসের বিদ্যমান সমস্ত শিষ্টাচার ও নিয়মকানুন ভেঙে ফেলতেই বেশি আগ্রহী ছিল।
প্রকৃতপক্ষে, মনজুর ভাই এক বছরেরও বেশি সময় ধরে লেখালেখি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাঁর প্রয়াণের পর বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা অন্যদিন-এর সম্পাদক এবং তাঁর গুণমুগ্ধ বন্ধু মাজহারুল ইসলাম আমাকে জানিয়েছিলেন যে, এক বছর আগে মনজুর ভাই পত্রিকাটির জন্য একটি গল্প লিখবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। পরে তিনি মাজহারকে বলেছিলেন যে, এক-দুই পৃষ্ঠা লেখার পর তিনি আর এগোতে পারেননি, কারণ তাঁর ভেতর থেকে আর কোনো সৃজনশীল চিন্তা আসছিল না।
আমি জানতাম যে কয়েক সপ্তাহ আগে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউটে একটি বক্তব্য দেওয়ার উদ্দেশে তিনি নিউ ইয়র্ক বা বোস্টন হয়ে শিকাগো যাচ্ছিলেন। কিন্তু উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর পরপরই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পর ঢাকা ক্লাবের আরেকটি আড্ডায় যখন তাঁর সাথে দেখা হয়, তখন তাঁকে আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল দেখাচ্ছিল। ১ অক্টোবরের সেই আড্ডায় তিনি আরও বেশি ভেঙে পড়েছিলেন। আমি আবারও তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তিনি অসুস্থ বোধ করছেন কি না। তিনি বরাবরের মতোই বলেছিলেন যে তিনি ঠিক আছেন, শুধু মানসিকভাবে কিছুটা বিষণ্ণ।
তাই ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর দুপুরের ঠিক আগে যখন ফোন পেলাম যে মনজুর ভাই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন—যিনি তখন গাড়িতে করে ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টসে ক্লাস নিতে যাচ্ছিলেন এবং দৃশ্যত স্ট্রোক করেছিলেন—তখন আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। সম্প্রতি তাঁর চেহারায় যে দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল, তা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি এত হঠাৎ করে গুরুতর হৃদরোগের শিকার হতে পারেন? তাঁকে সবসময়ই অক্লান্ত মনে হতো; তাঁর পেশাগত জীবনের অধিকাংশ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়ানোর পাশাপাশি তিনি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েরও খণ্ডকালীন অনুষদ সদস্য ছিলেন। আর তিনি যেন ছিলেন চিরকালই এক অফুরান লেখক, যিনি সব ধরণের প্রকাশনায়—সেটি একাডেমিক হোক, সাহিত্যিক হোক বা সমসাময়িক বিষয় ভিত্তিক—প্রচুর লিখে যেতেন। প্রকৃতপক্ষে, ব্যতিক্রমী পাঠদান ক্ষমতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টায় তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখার সামর্থ্যের কারণে সব মহলেই তাঁর বিপুল চাহিদা ছিল। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে আয়োজিত সেমিনারগুলোতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত একজন বিশিষ্ট বক্তা। তদুপরি, তাঁর কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের পাঠকদের মতো টক-শোর গুণগ্রাহীরাও সবসময় তাঁর উপস্থিতির অপেক্ষায় থাকতেন।
২
প্রকৃতপক্ষে, যতদিন আমি তাঁকে চিনেছি, মনজুর ভাই আমার কাছে সীমাহীন শক্তি ও সৃজনশীলতার এক আধার হিসেবে প্রতিভাত হয়েছেন। সেমিনার ও কনফারেন্সে একজন উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষাবিদ, মূল বক্তা কিংবা বিশেষ বক্তা হিসেবে, এমনকি রাজনীতি, সাহিত্য ও দেশের সমসাময়িক অবস্থা নিয়ে টক-শোতে মন্তব্যকারী একজন তারকা ব্যক্তিত্ব হিসেবেও—সব ধরণের কর্মকাণ্ডেই তিনি অদম্য উৎসাহ নিয়ে অংশগ্রহণ করতেন। তাঁকে এককালে ‘রেনেসাঁ পুরুষ’ বলা হতো এবং বর্তমানে প্রায়ই যাকে ‘পলিম্যাথ’ বা বহুমুখী পণ্ডিত হিসেবে অভিহিত করা হয়, তিনি ছিলেন ঠিক তা-ই। জীবন ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর উদ্যম ও আগ্রহ ছিল যেন অসীম। সব ধরণের বই তিনি এমন এক ক্ষুধা নিয়ে পড়তেন যা মনে হতো কখনওই মেটার নয়।
আমি একবার মঞ্জুর ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম: এত কিছু পড়ার সময় তিনি পান কীভাবে? ঢাকা ক্লাবে আমাদের শেষ সাক্ষাতের দিন আমি তাঁকে আবারও প্রশ্ন করেছিলাম: “আপনি এখনও এত পড়েন এবং এত কিছু লিখেছেন—বলুন তো—আপনি কি আদৌ ঘুমান?” প্রথম প্রশ্নের উত্তরে তিনি হাসিমুখে বলেছিলেন, “কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে যখন পিএইচডি করছিলাম, তখন আমি দ্রুত পঠন বা স্পিড রিডিংয়ের একটি কোর্স করেছিলাম, সম্ভবত সেটাই আমার এত পড়ার একটি কারণ।” আর ঢাকা ক্লাবের সেই শেষ আড্ডায় করা আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন: “আমি প্রতিদিন রাত ১টায় ঘুমাতে যাই এবং পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা খুব গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকি। আর তুমি তো জানোই, আমি যেকোনো সময় এবং যেকোনো জায়গায় একটু ঝিমিয়ে নিতে পারি।”
মনজুর ভাই আমাকে জানিয়েছিলেন যে তিনি এক বইপ্রেমী পরিবারে জন্মেছিলেন। সিলেটে তাঁর মা স্কুল থেকে ফিরে দুপুরের খাবারের পর বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়তেন। তাঁর মামা ছিলেন বিখ্যাত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী—যিনি ছিলেন এক সহজাত গল্পকার এবং আড্ডাবাজ, এবং একজন অভিজ্ঞ গল্পবলিয়ে (raconteur), যিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং বিরামহীনভাবে সকলকে আনন্দ দিতেন। অর্থাৎ, বই পড়া এবং গল্প বলা তাঁর রক্তে মিশে ছিল। আড্ডার প্রাণ হয়ে থাকা এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে চমৎকার গল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা ছিল তাঁর স্বভাবজাত।
৩
মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে মনজুর ভাই আমার একটি অনুরোধে একটি প্রবন্ধ লিখে দিয়েছিলেন। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবসরজীবন কাটানো, এবং অ্যাডিলেডের ফ্লিন্ডারস বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপনারত, আমার প্রিয় সহকর্মী অধ্যাপক এম. কাইয়ুম এবং আমি একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের চেষ্টা করছি। তাঁর প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল “Translating Rabindranath Tagore and the Challenges of Adequacy and Untranslatability”, যা থেকে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ এবং অনুবাদ—এই দুটি বিষয়ের প্রতিই তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস এবং বিশ্বভারতীর গ্রন্থন বিভাগ থেকে প্রকাশিত দি এসেনশিয়াল টেগোর (২০১১)—যা আমি এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্গী কলেজের তৎকালীন অধ্যাপক রাধা চক্রবর্তী সম্পাদনা করেছিলাম—সেই অনুদিত সংকলনটির জন্য তিনি রবীন্দ্রনাথের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রিয় গ্রন্থ ছিন্নপত্র-এর কিছু চিঠির চমৎকার অনুবাদ করেছিলেন; যার শিরোনাম তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে অনুবাদ করেছিলেন টর্ন লিভস (Torn Leaves) হিসেবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বাংলা সাহিত্যের অন্য উজ্জ্বল নক্ষত্র কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কেও মনজুর ভাই সমভাবে জ্ঞান রাখতেন। প্রকৃতপক্ষে, বাংলার এই ‘বিদ্রোহী’ কবি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা দেখে আমি মুগ্ধ ও অভিভূত হয়েছিলাম যখন তিনি, আমাদের আরেক আড্ডার বন্ধু ও সহকর্মী কায়সার হক এবং আরও কয়েকজন নজরুল-অনুরাগী মিলে এমন একটি সংকলন তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন যাকে আমরা দি এসেনশিয়াল টেগোর-এর সহযোগী গ্রন্থ হিসেবে ভেবেছিলাম এবং যার সাময়িক শিরোনাম দিয়েছিলাম দি এসেনশিয়াল নজরুল। প্রায় এক বছর ধরে আমরা নিয়মিত মিলিত হয়ে অত্যন্ত উৎসাহের সাথে এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করতাম এবং নজরুল একাডেমির জন্য নজরুলের ওপর আমাদের কাজগুলো একে অপরের সাথে ভাগ করে নিতাম। দুর্ভাগ্যবশত, নজরুল একাডেমির প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে সেই প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি। আমার মনে হয়, শেষ কয়েক মাস তাঁর মন খারাপ থাকার পেছনে এটিও একটি বড় কারণ ছিল।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশ-বিদেশের শ্রেষ্ঠ বাঙালি লেখকদের সান্নিধ্যে থাকার সুবাদে বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী কর্মগুলো পাঠের অভ্যাস গড়ে উঠলেও, মঞ্জুর ভাই একেবারে অল্প বয়স থেকেই নিজের পছন্দে ইংরেজি সাহিত্যে বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেখানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি লেকচারার হিসেবে সেই বিভাগেই যোগদান করেন। তিনি আমাকে একবার বলেছিলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া ছাড়া তাঁর আর অন্য কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই, এরপর তিনি ইংরেজি সাহিত্যে ডক্টরেট করতে কানাডার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে যান এবং সেখানে ডব্লিউ. বি. ইয়েটসের ওপর তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ লেখার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে তাঁর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের ইংরেজি সাহিত্য ও আধুনিকতাবাদ বিশেষজ্ঞ বিশিষ্ট পণ্ডিত নরম্যান ম্যাকেঞ্জি।
আমি আগেই যেমনটি লিখেছিলাম, মনজুর ভাই আমাকে বলেছিলেন যে তিনি কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন ‘স্পিড রিডিং’ বা দ্রুত পঠন শিখেছিলেন। তবে আমি তাঁর কাছ থেকে এও জেনেছিলাম যে, একই সময়ে একজন স্নাতক ছাত্র হিসেবে ফর্মালিজম (আকারবাদ) এবং ক্রিটিক্যাল থিওরির সর্বশেষ ধারাগুলোর সংস্পর্শে এসে তিনি কীভাবে ‘ক্লোজ রিডিং’ বা নিবিড় পাঠেও পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। অন্য কথায়, একনিষ্ঠ পাঠক হওয়ার সুবাদে তিনি নানা ধরণের লেখক এবং সাহিত্যিক ধারার সংস্পর্শে এসেছিলেন যেগুলোতে তিনি চাইলে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিতে পারতেন; কিন্তু একইসাথে তিনি ‘ক্লোজ রিডিং’-এর একজন ওস্তাদ হয়ে উঠেছিলেন, কারণ তিনি শিখেছিলেন কীভাবে পঠিত বইয়ের গভীরে প্রবেশ করতে হয়, সেখান থেকে মূল্যবান অংশগুলো ছেঁকে নিতে হয় এবং তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তিতে সেই সমস্ত কিছু ধরে রাখতে হয়। সাহিত্যতত্ত্ব, সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন এবং নন্দনতত্ত্বের ওপর তাঁর এই অসাধারণ দখলের ফলে সাহিত্য ও শিল্পকলাকে নতুনভাবে দেখার এক বিশাল দক্ষতা তিনি অর্জন করেছিলেন।
তাঁর এই ছন্নছাড়া পাঠাভ্যাস, বিচিত্র ঘরানার লেখকগোষ্ঠীর সাথে মেলামেশা এবং অনূদিত বিশ্বসাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগেরই একটি ফল ছিল তাঁর প্রথম প্রবন্ধ সংকলন; বইটির শিরোনামের মাধ্যমে তিনি একে অলস দিনের হাওয়া বা অবসরের পঠনলব্ধ নির্যাস হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। যদিও তিনি ইতোমধ্যেই বিভিন্ন বিদ্যায়তনিক জার্নালে ইংরেজিতে বেশ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন এবং আরও কিছুকাল তা অব্যাহত রেখেছিলেন, কিন্তু সেগুলো সংগ্রহ করে রাখার ব্যাপারে তিনি মোটেও ভাবেননি। এর পরিবর্তে, আশির দশক থেকে তিনি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সাহিত্য পত্রিকা ও প্রধান সংবাদপত্রগুলোর সাহিত্য পাতায় নিয়মিতভাবে বাংলায় ছোটগল্প প্রকাশ করতে শুরু করেন, যার মূলে নিঃসন্দেহে ছিল ইংরেজি কথাসাহিত্যের ওপর তাঁর ব্যাপক ও নিয়মিত পাঠের প্রভাব। তাঁর এই গল্পগুলোতে কেবল পরাবাস্তববাদ, জাদুবাস্তববাদ এবং উত্তর-আধুনিক কথাসাহিত্যের মতো পরীক্ষামূলক ধারার প্রতি তাঁর মুগ্ধতাই প্রকাশ পায়নি, বরং যা পড়ছেন তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের লেখায় নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ক্ষমতাও ফুটে উঠেছিল। তাঁর একেকটি বিশেষ ধরণের গল্প যেমন জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়ের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও জীবনের অদ্ভুত দিকগুলোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠত, তেমনি তাতে থাকত এক ধরণের বুদ্ধিদীপ্ত ও বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে অসম্ভব ও সুদূরপরাহত কল্পনার জগতে পাড়ি দেওয়ার মুন্সিয়ানা। কেবল ইংরেজি জানা পাঠকদের জন্য আমি তাঁর অনূদিত ছোটগল্পের সংকলন দ্য মারম্যান’স প্রেয়ার (২০১৩) বইটি সুপারিশ করব। তবে ইংরেজি বা বাংলা যে মাধ্যমেই পড়া হোক না কেন, তাঁর ছোটগল্প ও উপন্যাসিকাগুলো পাঠকদের কাছে এমন একজন মানুষের পরিচয় উন্মোচন করবে যাকে আমি গভীরভাবে চিনেছি এবং শ্রদ্ধা করেছি—যিনি ছিলেন ফরাসি ভাষায় যাকে বলে ‘বনহমি’ (bonhomie) বা অমায়িকতা ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর একজন মানুষ; যাঁর ছিল অসামান্য সহানুভূতি প্রকাশের ক্ষমতা; এবং এমন একজন লেখক যিনি তাঁর পাণ্ডিত্য, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক আগ্রহ, আধুনিকতাবাদ, সাহিত্যতত্ত্ব ও সমকালীন কথাসাহিত্যের পাশাপাশি শিল্প ও নন্দনতত্ত্বের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এমন এক বিরল সংমিশ্রণ তৈরি করতে পারতেন যা বাংলা কথাসাহিত্যে সচরাচর দেখা যায় না।
মনজুর ভাই নিয়মিত বাংলায় তাঁর কথাসাহিত্য ও নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক লেখাগুলো প্রকাশ করে গেলেও, এবং সম্পাদকদের অনুরোধে তাঁর কিছু তাত্ত্বিক ও সমালোচনামূলক প্রবন্ধ জার্নাল বা বইয়ের জন্য পাঠালেও, ইংরেজিতে লেখা তাঁর প্রবন্ধগুলো কোথাও প্রকাশের ব্যাপারে তিনি নিজে থেকে কোনো উদ্যোগ নিতেন না। অধ্যাপক কাইয়ুম এবং আমি যে স্মারক গ্রন্থটি (festschrift) শীঘ্রই প্রকাশের আশা করছি, সেখানে রবীন্দ্রনাথ ও অনুবাদ বিষয়ে তিনি যে চমৎকার প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, তা আমার কাছে একটি উদাহরণ হয়ে আছে যে তিনি তাঁর অত্যন্ত মানসম্মত ইংরেজি লেখাগুলোর প্রতি কতটা উদাসীন ছিলেন। তাঁর স্মরণে লেখা এই স্মারক নিবন্ধটির উপসংহারে আমি দৃঢ়ভাবে অনুভব করছি যে, তাঁর বন্ধু ও অনুরাগীদের অবশ্যই তাঁর ইংরেজি বা বাংলায় লেখা অপ্রকাশিত শ্রেষ্ঠ কাজগুলো সংগ্রহ ও প্রকাশের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, কারণ আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দিগন্ত থেকে এই লেখাগুলো হারিয়ে যাওয়া মোটেও বাঞ্ছনীয় নয়।
৪
হাসপাতালে মনজুর ভাইয়ের শেষ দিনগুলো এবং তাঁর প্রয়াণ পরবর্তী সপ্তাহগুলো এক অভাবনীয় শোক ও অবিশ্বাসে আচ্ছন্ন ছিল। জীবনের পূর্ণতায় থাকা একজন মানুষ এত দ্রুত কীভাবে চলে যেতে পারেন? মনজুর ভাইয়ের প্রয়াণে যে শোকের ঢেউ নেমে এসেছিল, তা ছিল নজিরবিহীন। পশ্চিম বাংলা এবং নেপালের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরাও তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। যখন তাঁর কফিন ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয়, তখন হাজার হাজার মানুষ অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁকে বিদায় জানায়। সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল—মনে হচ্ছিল প্রকৃতিও তাঁর এই অকাল বিদায়ে কাঁদছে।
এখন আমরা কেবল তাঁর প্রিয় আড্ডাগুলোতে এবং এ ধরনের স্মারক গ্রন্থে তাঁকে স্মরণ করতে পারি। তাঁর অপ্রকাশিত লেখাগুলো রক্ষা ও প্রকাশ করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। তাঁর বন্ধু, সহকর্মী, পাঠক ও স্বজনরা জানেন এই ক্ষতির গভীরতা কতখানি; তবুও তাঁর কর্ম এবং স্মৃতির মাধ্যমেই তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন। শান্তিতে ঘুমান, প্রিয় মনজুর ভাই!
ফকরুল আলম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের উপদেষ্টা।
তারিখ: এপ্রিল ৩০, ২০২৬



AstuteHorse